ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (২০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর)

অধ্যায় ১৪ প্রকল্পের বিষয়সমূহ

অধ্যায় ১৪
প্রকল্প তথ্য বিবরণী

ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প, প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা, পরিবেশগত সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ-পুনর্বাসন এবং অর্থনৈতিক সুফল সম্পর্কিত ২০টি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ প্রশ্নের বিস্তারিত তথ্যভিত্তিক উত্তর।

ফুলবাড়ী কয়লা ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক জেওআরসি (JORC) কোড অনুযায়ী ৫৭২ মিলিয়ন টন উচ্চমানের বিটুমিনাস কয়লা মজুদ রয়েছে। প্রকল্পটি উন্মুক্ত খনি (Open Pit) পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে এবং খনির সম্ভাব্য স্থায়িত্বকাল ৩০ বছরেরও বেশি। সর্বোচ্চ উৎপাদন পর্যায়ে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হবে।

উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে ফুলবাড়ীর মোট কয়লা মজুদের ৯০% এরও বেশি কয়লা উত্তোলন সম্ভব, যেখানে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে মাত্র ১০-১৫% কয়লা তোলা যায় এবং বাকি ৮৫-৯০% সম্পদ চিরতরে ভূগর্ভে নষ্ট হয়ে যায়। আধুনিক প্রকৌশল, ড্রেনেজ বাধা প্রাচীর এবং উন্নত পানি নিষ্কাশন প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্মুক্ত খনি অত্যন্ত নিরাপদ ও লাভজনকভাবে পরিচালনা করা যায়।

ফুলবাড়ীর কয়লা বিশ্বমানের প্রিমিয়াম থার্মাল কয়লা ও সেমি-সফট কোকিং কয়লা। এতে ছাইয়ের পরিমাণ (Ash) মাত্র ১২-১৫%, আর্দ্রতা কম, এবং সালফারের পরিমাণ ১% এর নিচে (০.৬% - ০.৮%)। এর ক্যালোরিফিক মান অত্যন্ত উচ্চ (৬,৬০০ থেকে ৭,০০০ কিলোক্যালরি/কেজি), যা অস্ট্রেলিয়ার হান্টার ভ্যালি কয়লার সমমানের।

বর্তমানে বাংলাদেশে কয়লা প্রধানত বিদ্যুৎ উৎপাদন (বড়পুকুরিয়া, পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ী ইত্যাদি) এবং ইটভাটায় জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি ও শিল্পের গ্যাস সংকট মোকাবেলায় কয়লার সাশ্রয়ী ব্যবহার অপরিহার্য।

হ্যাঁ, বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাথে চুক্তি নং ১১/সি-৯৪ এর আওতায় এশিয়া এনার্জির বৈধ চুক্তি ও অনুসন্ধান লাইসেন্স রয়েছে। চুক্তি অনুসারে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও পরিবেশগত সমীক্ষা সম্পন্ন করার পর পূর্ণ খনি উন্নয়ন পরিকল্পনা সরকারের নিকট দাখিল করা হয়েছে।

পুরো ৩০ বছরের প্রকল্প মেয়াদে পর্যায়ক্রমে প্রায় ৫,১৯২ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন হবে। তবে একবারে পুরো জমি নেওয়া হবে না; পর্যায়ক্রমে খনন, পুনর্বাসন ও কৃষিজমিতে রূপান্তর কার্যক্রম পরিচালিত হবে। খনি শেষে প্রায় ৮০% জমি পুনরায় উন্নত কৃষিজমি হিসেবে স্থানীয়দের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

সমীক্ষা অনুসারে খনি ও সহযোগী প্রকল্পের কারণে পর্যায়ক্রমে প্রায় ৯,৩০০ পরিবার বা প্রায় ৪০,০০০ মানুষ স্থানান্তরের আওতায় আসবেন। তবে এই স্থানান্তর দীর্ঘমেয়াদে পর্যায়ক্রমে পরিচালিত হবে।

এশিয়া এনার্জির প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, বিশ্বব্যাংক/আইএফসি মানদণ্ড এবং সরকারের সাথে সম্পাদিত চুক্তির শর্তাবলী দ্বারা আইনত সুরক্ষিত। কোম্পানি সকল পরিবেশগত ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা সরকারের অনুমোদন ও আন্তর্জাতিক নিরীক্ষণের আওতায় বাস্তবায়ন করবে।

প্রকল্পের আওতায় ১৬টি সুনির্দিষ্ট পরিবেশগত ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (ESMP) প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বায়ুমান সংরক্ষণ, ধুলাবালি প্রতিরোধ, শব্দ ও কম্পন নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং দ্রুত সবুজায়ন।

না, কোনো পানির সংকট হবে না। সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার আওতায় উত্তোলিত ভূগর্ভস্থ পানি গভীর নলকূপ ও পাইপলাইনের মাধ্যমে আশেপাশের সকল গ্রাম ও ফসলি জমিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও সেচের জন্য বিনামূল্যে সরবরাহ করা হবে। অবশিষ্ট পানি পার্শ্ববর্তী জলস্তরে রি-ইনজেকশন (পুনঃপ্রবেশ) করানো হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসমূহের টেকসই আয়ের জন্য 'সামাজিক বিনিয়োগ তহবিল' (Social Investment Fund) গঠন করা হবে। উন্নত কৃষি প্রযুক্তি, মৎস্য চাষ, পশু পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং পেশাগত কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রত্যেকের বিকল্প ও উন্নত জীবিকা নিশ্চিত করা হবে।

হ্যাঁ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের উপযুক্ত সদস্যদের খনি কার্যক্রমে ও সহযোগী শিল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ দেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য একটি ডেডিকেটেড প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হবে।

প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ এবং পরোক্ষভাবে সাপ্লাই চেইন, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও নতুন শিল্প কারখানায় ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ এরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

এশিয়া এনার্জি ব্যাপক জনমত জরিপ, উঠান বৈঠক এবং তথ্য পুস্তিকার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ কাঠামো প্রচার করেছে। সকল ক্ষতিগ্রস্তকে বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি ন্যায্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং আধুনিক আবাসন প্রদান করা হবে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (World Bank Safeguard Policy) অনুসারে বৈধ দলিল না থাকলেও জমিতে বসবাসকারী বা নির্ভরশীল সকল আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষ সমানভাবে পুনর্বাসন, উন্নত নতুন ঘর ও বিকল্প জীবিকা সহায়তার পূর্ণ সুবিধা পাবেন। আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিচয় সংরক্ষণে বিশেষ 'Indigenous Peoples Development Plan' বাস্তবায়ন করা হবে।

খনন শুরুর পূর্বে মাটির উপরিভাগের উর্বর অংশ (Topsoil) আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হবে। পরবর্তীতে জমি ভরাট করার পর এই মাটি পুনরায় বিছিয়ে আধুনিক জৈব প্রযুক্তিতে চাষাবাদের উপযোগী করা হবে। ফলস্বরূপ পুনর্বাসিত জমির ফসল উৎপাদন ক্ষমতা আগের চেয়ে ২০-৩০% বৃদ্ধি পাবে।

কয়লা উত্তোলনের উপর সরকার সরাসরি ৬% নগদ রয়্যালটি পাবে। এছাড়া কর্পোরেট ট্যাক্স, ভ্যাট, লভ্যাংশ, শুল্ক এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে পুরো প্রকল্প মেয়াদে সরকার সরাসরি ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি রাজস্ব আয় করবে এবং জাতীয় জিডিপিতে প্রতি বছর প্রায় ১% অবদান থাকবে।

না, ৬% রয়্যালটি আন্তর্জাতিক খনি শিল্পের প্রচলিত হার ও বাংলাদেশ খনি বিধিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। লক্ষণীয় যে, কোম্পানির মোট মুনাফার বড় অংশই ট্যাক্স, আমদানি শুল্ক, ডিভিডেন্ড ও অন্যান্য রাজস্ব হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা হবে।

ফুলবাড়ী খনি উন্নয়ন, যন্ত্রপাতি আমদানি, রেলওয়ে ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণে মোট প্রায় দেড় থেকে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১.৫ - ২.০ বিলিয়ন ডলার) প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) আসবে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একক বৃহত্তম বেসরকারি বিনিয়োগগুলোর অন্যতম।

খনির পানি নিষ্কাশন আধুনিক হাইড্রো-জিওলজিক্যাল মডেলিং ও ব্যারিয়ার কার্টেনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুরক্ষিতভাবে পরিচালিত হবে। উত্তোলিত পানি পরিশোধন করে গৃহস্থালী, শিল্প ও কৃষিকাজে ব্যবহার করা হবে এবং অতিরিক্ত পানি মাটির নিচে কৃত্রিম রিচার্জ ওয়েলের মাধ্যমে পুনরায় প্রবেশ করানো হবে যাতে পার্শ্ববর্তী এলাকার মাটির নিচের জলস্তর অক্ষুণ্ণ থাকে।